জমির খাজনা চেক করার নিয়ম জানা প্রতিটি ভূমি মালিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন আর ভূমি অফিসে যেতে হয় না; ঘরে বসেই অনলাইনে জমির খাজনা দেখা, বকেয়া যাচাই, রসিদ ডাউনলোড এবং পেমেন্ট করা যায়।
সঠিক প্রক্রিয়া জানলে সময়, খরচ ও ঝামেলা সবই কমে যায়। তাই জমির মালিকানা বজায় রাখা, রেকর্ড হালনাগাদ রাখা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়াতে অনলাইনে জমির খাজনা চেক করার নিয়ম অবশ্যই জানা দরকার।
আজকের এই ব্লগে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কীভাবে অনলাইনে জমির খাজনা চেক করবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে এবং এর ধাপগুলো কী কী।
জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর কী?
সহজ কথায়, কোনো নির্দিষ্ট জমি ভোগদখল করার জন্য সরকারকে বাৎসরিক যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়, তাকেই জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর বলা হয়। ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ হলেও অকৃষি জমি এবং ২৫ বিঘার ওপর কৃষি জমির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে কর প্রদান করতে হয়। এই খাজনা পরিশোধের রশিদ (দাখিলা) জমির মালিকানার অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণপত্র।
অনলাইনে খাজনা চেক করতে কী কী লাগবে?
অনলাইন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে আপনার কাছে কিছু তথ্য এবং নথিপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে কাজের মাঝপথে আপনাকে থামতে হবে না।
১. মোবাইল ফোন নম্বর: একটি সচল মোবাইল নম্বর (যেটি আপনার নিজের বা পরিবারের কারো নামে নিবন্ধিত)।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): জমির মালিকের এনআইডি কার্ডের নম্বর এবং জন্ম তারিখ।
৩. জমির খতিয়ান নম্বর: আপনার জমির আরএস (RS) বা বিএস (BS) খতিয়ান নম্বর।
৪. দাগ নম্বর: জমির দাগ নম্বর জানা থাকলে ভালো।
৫. হোল্ডিং নম্বর: বিগত বছরে খাজনা দিয়ে থাকলে সেই রশিদে একটি হোল্ডিং নম্বর থাকে। এটি জানা থাকলে কাজ সবচেয়ে দ্রুত হয়।
৬. মৌজার নাম: জমিটি কোন মৌজায় অবস্থিত তা জানতে হবে।
জমির খাজনা চেক করার নিয়ম: অনলাইনে ধাপসমূহ
ভূমি মন্ত্রণালয় একটি নির্দিষ্ট পোর্টাল (ldtax.gov.bd) চালু করেছে যার মাধ্যমে এই সেবা পাওয়া যায়।
নিচে ধাপে ধাপে জমির খাজনা চেক করার প্রক্রিয়াটি বর্ণনা করা হলো:
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে আপনার কম্পিউটার বা মোবাইলের ব্রাউজার ওপেন করুন। এরপর এড্রেস বারে লিখুন ldtax.gov.bd এবং এন্টার দিন। এটি আপনাকে ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের মূল পাতায় নিয়ে যাবে।
টিপস: মোবাইল ব্যবহারকারীরা গুগল প্লে স্টোর থেকে “ভূমি উন্নয়ন কর” (Bhumi Unnayan Kor) অ্যাপটি ডাউনলোড করেও এই কাজটি করতে পারেন।
ধাপ ২: নাগরিক কর্নারে নিবন্ধন
ওয়েবসাইটের মূল মেনু থেকে “নাগরিক কর্নার” অপশনটি নির্বাচন করুন। আপনি যদি প্রথমবারের মতো এই সাইট ব্যবহার করেন, তবে আপনাকে নিবন্ধন করতে হবে।
মোবাইল নম্বর দিন: নির্দিষ্ট বক্সে আপনার সচল মোবাইল নম্বরটি লিখুন।
এনআইডি ও জন্ম তারিখ: এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং জন্ম তারিখ (দিন-মাস-বছর) সঠিকভাবে পূরণ করুন।
পরবর্তী বোতাম: তথ্য দেওয়ার পর ‘পরবর্তী পদক্ষেপ’ বোতামে ক্লিক করুন।
আপনার দেওয়া তথ্য সঠিক হলে সিস্টেম অটোমেটিক আপনার নাম এবং ছবি এনআইডি সার্ভার থেকে ভেরিফাই করে দেখাবে।
ধাপ ৩: ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশন
আপনার মোবাইলে একটি ৪ বা ৬ সংখ্যার ওটিপি (One Time Password) পাঠানো হবে। ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট বক্সে এই কোডটি বসিয়ে “যাচাই করুন” বাটনে ক্লিক করুন। ভেরিফিকেশন সফল হলে আপনাকে একটি পাসওয়ার্ড সেট করতে বলা হতে পারে অথবা সরাসরি ড্যাশবোর্ডে নিয়ে যাওয়া হবে।
ধাপ ৪: প্রোফাইল ও খতিয়ান যুক্ত করা
লগইন করার পর আপনি আপনার ড্যাশবোর্ড দেখতে পাবেন। খাজনা চেক করার জন্য আপনার জমির তথ্য সিস্টেমে যুক্ত করতে হবে।
১. খতিয়ান যুক্ত করুন: মেনু থেকে “খতিয়ান যুক্ত করুন” বা “নতুন খতিয়ান” অপশনে ক্লিক করুন।
২. বিভাগ ও জেলা নির্বাচন: ড্রপডাউন মেনু থেকে আপনার জমির বিভাগ, জেলা, উপজেলা এবং মৌজা নির্বাচন করুন।
৩. খতিয়ান নম্বর: সর্বশেষ খতিয়ান নম্বরটি লিখুন।
৪. হোল্ডিং নম্বর: যদি আপনার কাছে আগের খাজনা দেওয়ার রশিদ থাকে, তবে সেখানে থাকা হোল্ডিং নম্বরটি লিখুন। হোল্ডিং নম্বর দিলে খাজনার পরিমাণ বা ‘দাবি’ সরাসরি দেখা যায়।
৫. সংযুক্তি (ঐচ্ছিক): অনেক সময় খতিয়ানের স্ক্যান কপি বা আগের রশিদের ছবি আপলোড করতে বলা হতে পারে।
সব তথ্য পূরণ করে “সংরক্ষণ করুন” বাটনে ক্লিক করুন। আপনার তথ্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পাঠানো হবে। সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এটি অনুমোদিত হয়, তবে হোল্ডিং নম্বর জানা থাকলে সাথে সাথেই তথ্য দেখা যায়।
ধাপ ৫: খাজনার পরিমাণ বা ‘দাবি’ দেখা
আপনার জমির তথ্য অনুমোদিত হয়ে গেলে বা সিস্টেমে আগে থেকেই থাকলে, আপনি ড্যাশবোর্ডে আপনার জমির তালিকা দেখতে পাবেন।
জমির তালিকার পাশে “বিস্তারিত” বা “করুন” বাটনে ক্লিক করুন।
সেখানে আপনি “দাবি” নামক একটি অপশন পাবেন।
এই “দাবি” অপশনে ক্লিক করলেই আপনি দেখতে পাবেন আপনার বর্তমান বকেয়া খাজনা কত, সুদ কত (যদি থাকে) এবং মোট কত টাকা পরিশোধ করতে হবে।
হোল্ডিং নম্বর না জানলে করণীয় কী?
অনেকের কাছেই পুরনো দাখিলা বা রশিদ থাকে না, ফলে তারা হোল্ডিং নম্বর জানেন না।
সেক্ষেত্রে:
১. খতিয়ান দিয়ে খুঁজুন: সিস্টেমে মৌজা এবং খতিয়ান নম্বর দিয়ে সার্চ দিন। যদি আপনার ভূমি অফিস খতিয়ানগুলো অনলাইনে এন্ট্রি করে থাকে, তবে আপনি মালিকের নাম দেখতে পাবেন এবং সেখান থেকে হোল্ডিং নম্বরটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
২. ভূমি অফিসে যোগাযোগ: যদি অনলাইনে কোনোভাবেই তথ্য না পান, তবে আপনার খতিয়ান ও দলিলের কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। তারা আপনার খতিয়ানের বিপরীতে একটি হোল্ডিং নম্বর খুলে দেবে এবং সিস্টেমে এন্ট্রি করে দেবে। এরপর আপনি বাসায় এসেই খাজনা চেক ও পেমেন্ট করতে পারবেন।
অনলাইনে খাজনা চেক করার সুবিধাসমূহ
সনাতন পদ্ধতির চেয়ে ডিজিটাল পদ্ধতির সুবিধা অনেক:
সময়ের সাশ্রয়: অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
স্বচ্ছতা: অতিরিক্ত টাকা দাবি করার সুযোগ নেই। সিস্টেম যা হিসাব করে দেবে, ঠিক তাই পরিশোধ করতে হবে।
সহজ সংরক্ষণ: ডিজিটাল দাখিলা হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে যেকোনো সময় আবার ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা যায়।
হয়রানি মুক্তি: দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নেই।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
আমি কি বিদেশে বসে দেশের জমির খাজনা দিতে পারব?
হ্যাঁ, আপনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে লগইন করে আপনার ব্যাংক কার্ড বা এমএফএস (MFS) এর মাধ্যমে খাজনা চেক ও পরিশোধ করতে পারবেন।
অনলাইনে কি সব জমির তথ্য পাওয়া যায়?
সরকার সারা দেশের জমির তথ্য ডিজিটালাইজ করার কাজ করছে। অধিকাংশ মৌজার তথ্য অনলাইনে আছে। যদি আপনারটি না থাকে, তবে একবার স্থানীয় ভূমি অফিসে গিয়ে তথ্য হালনাগাদ (Update) করে নিতে হবে।
জমির খাজনা কত বছর পর পর দিতে হয়?
প্রতি বাংলা সনের ১লা বৈশাখ থেকে ৩০শে চৈত্র পর্যন্ত অর্থবছর ধরা হয়। প্রতি বছরই খাজনা পরিশোধ করা উত্তম। পরপর ৩ বছর খাজনা না দিলে বকেয়ার ওপর নির্দিষ্ট হারে সুদ যুক্ত হয় এবং সার্টিফিকেট মামলা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শেষ কথা
জমির খাজনা চেক করা এবং পরিশোধ করা এখন আর কোনো ভয়ের বা ঝামেলার কাজ নয়। এটি আপনার নাগরিক দায়িত্ব এবং জমির মালিকানা সুরক্ষার কবচ। তাই আর দেরি না করে আজই ldtax.gov.bd তে ভিজিট করুন এবং আপনার জমির খাজনার স্ট্যাটাস চেক করে নিন। নিয়মিত খাজনা দিন, আইনি ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকুন।


